08/07/2026
নফস ডায়েরি: মিথ্যা অপবাদের মুখোমুখি হলে আমাদের মন যা বলে...
গত পোস্টে আপনাদের কমেন্টগুলো (A, B, C, D) পড়ছিলাম। সত্যি বলতে, প্রতিটি উত্তরের পেছনে যেন একেকটা মানুষের না-বলা গল্প, চাপা অভিমান আর যাপিত জীবনের চিত্র লুকিয়ে আছে।
একজন সাইকোলজিস্ট হিসেবে আমি আপনাদের উত্তরগুলোকে কোনো 'সঠিক' বা 'ভুল' স্কেলে মাপতে বসিনি। বরং চলুন, একটু নিজের মনের আয়নায় তাকাই, আপনার উত্তরটি আসলে আপনার বর্তমান মানসিক অবস্থা সম্পর্কে কী বলছে:
A. সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে জবাব দেওয়া
যদি এটি আপনার উত্তর হয়ে থাকে, তবে হয়তো আপনি ভেতরে ভেতরে অনেকদিন ধরে অনেক কিছু চেপে রাখছেন। এই রাগটা শুধু নতুন কোনো আঘাতের জন্য নয়, বরং পুরোনো অনেক জমে থাকা অভিমানের বহিঃপ্রকাশ। সাইকোলজিতে একে আমরা 'Fight Response' বলি, আর ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি 'নফসে আম্মারা'-র একটি প্রতিরক্ষামূলক রূপ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, প্রকৃত বীর সে-ই যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে (সহীহ বুখারী)। আপনার এই রাগ কিন্তু অযৌক্তিক নয়, আঘাত পেলে রাগ হওয়াই স্বাভাবিক। শুধু একটু খেয়াল রাখা রাগটা যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং আপনি রাগকে বুঝতে পারেন।
B. কে বলেছে সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা
এই উত্তরটি যারা বেছে নিয়েছেন, আপনারা সম্ভবত নিজেদের জীবনে 'অনিশ্চয়তা' বা না-জানা বিষয়গুলো সহজে মেনে নিতে পারেন না। একটা প্রশ্ন মাথায় এলে সেটার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। এটি মানুষের খুব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তবে একটু ভেবে দেখুন তো, সব সত্যি জানলেই কি মনের শান্তি মেলে? অনেক সময় এই উত্তরের খোঁজ করতে গিয়ে আমরা নিজেদের অজান্তেই ওভারথিংকিংয়ের চক্রে পড়ে যাই। কুরআনেও আমাদের অতিরিক্ত অনুমান এবং অনুসন্ধান থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১২)। কারণ, যে বিষয়গুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেগুলো নিয়ে বেশি ভাবলে দিনশেষে আমাদের মনের প্রশান্তিই নষ্ট হয়।
C. খুব কষ্ট পাওয়া কিন্তু চুপ থাকা
সবচেয়ে বেশি মানুষ এই উত্তরটি দিয়েছেন, আর এটি আমাকে সবচেয়ে বেশি গভীরভাবে ভাবিয়েছে। আপনারা হয়তো স্বভাবগতভাবেই অনেক সংবেদনশীল (sensitive) এবং যত্নশীল (caring)। অন্যকে আঘাত করতে চান না বলে নিজের ভেতরেই সব কষ্ট জমিয়ে রাখেন। কিন্তু একটি সত্যি কথা বলি? চুপ থাকা মানেই কিন্তু কষ্টটা গায়েব হয়ে যাওয়া নয়। এই না-বলা কথাগুলো ভেতরে জমে থাকে, যা একসময় মানসিক বা শারীরিক ক্লান্তি হয়ে ফিরে আসে। আমরা অনেকেই এই কষ্ট চেপে রাখাকে 'সবর' ভেবে নিই। কিন্তু সবর মানে নিজের অনুভূতিগুলোকে অস্বীকার করা বা নিজেকে কষ্ট দেওয়া নয়, বরং অনুভূতির যত্ন নেওয়া।
D. আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করা
এটি আত্মনিয়ন্ত্রণের (Emotional Regulation) একটি চমৎকার উদাহরণ, যাকে আমরা 'নফসে মুতমাইন্নাহ' বা প্রশান্ত আত্মার রিফ্লেকশন বলতে পারি। কষ্ট পাওয়া সত্ত্বেও আবেগের কাছে হেরে না গিয়ে, পরিস্থিতিকে বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। আল্লাহ বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন" (সূরা বাকারা, ২:১৫৩)। এটি এমন একটি প্র্যাকটিস যা রাতারাতি আসে না, বরং নিজের মনের সাথে অনেক বোঝাপড়া করার পর এই স্তরে পৌঁছানো যায়।
সবশেষে একটি কথা, এই চারটি উত্তরের কোনোটিই আপনাকে 'খারাপ' বা 'দুর্বল' মানুষ প্রমাণ করে না। এগুলো কেবল নির্দেশ করে, আপনার মন এবং নফস এই মুহূর্তে কোন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর নিজের অনুভূতিগুলোকে বিচার (judge) না করে, সেগুলোকে চিনতে পারাটাই হলো হিলিং এর প্রথম ধাপ।
লেখাটি পড়ার পর নিজের সম্পর্কে নতুন কী বুঝতে পারলেন? বা এখন কি মনে হচ্ছে আপনার উত্তর অন্য কিছু হতে পারতো? নির্দ্বিধায় কমেন্টে শেয়ার করতে পারেন, আমি পড়ছি...
— Nafs & Noor